হাম: শিশুদের জন্য নীরব ঘাতক, টিকাই একমাত্র কার্যকর সুরক্ষা
হাম: শিশুদের জন্য নীরব ঘাতক, টিকাই একমাত্র কার্যকর সুরক্ষা
-
আপলোড সময় : 24 মে 2026 11:29:11 পূর্বাহ্ন
ছবির ক্যাপশন
হাম: শিশুদের জন্য নীরব ঘাতক, টিকাই একমাত্র কার্যকর সুরক্ষা
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। অনেকেই এটিকে সাধারণ জ্বর বা গায়ে দানা ওঠা রোগ মনে করলেও বাস্তবে এটি শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অরক্ষিত মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। তাই শিশুদের সুরক্ষায় সময়মতো হাম টিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
হাম কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
হাম রোগের কারণ হলো Measles Virus। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসটি বাতাসে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।
একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত—
জ্বর শুরু হওয়ার ৪ দিন আগে থেকে
এবং শরীরে র্যাশ ওঠার ৪ দিন পর পর্যন্ত
অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে।
বিশেষ করে—
অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম
এবং যেসব শিশু টিকা নেয়নি
তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
হামের লক্ষণসমূহ
হাম সাধারণত ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়। শুরুতে সাধারণ সর্দি-জ্বর মনে হলেও পরে জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষণ
উচ্চ জ্বর
শুকনো কাশি
নাক দিয়ে পানি পড়া
চোখ লাল হওয়া
দুর্বলতা ও অরুচি
পরবর্তী লক্ষণ
মুখের ভেতরে সাদা দাগ (Koplik spots)
শরীরে লালচে র্যাশ বা দানা
র্যাশ মুখ থেকে শুরু হয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে
হামের ভয়াবহ জটিলতা
অনেক অভিভাবক মনে করেন হাম হলে এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে এটি মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সম্ভাব্য জটিলতা
নিউমোনিয়া
ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
কানের ইনফেকশন
চোখের ক্ষতি বা অন্ধত্ব
মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)
খিঁচুনি
অপুষ্টি বৃদ্ধি
এমনকি মৃত্যু
বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে হাম এখনো একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত।
কেন হামের টিকা অত্যন্ত জরুরি?
হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় উপায়।
টিকা শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করলে অধিকাংশ শিশুই দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
প্রথম ডোজ আংশিক সুরক্ষা দেয়
দ্বিতীয় ডোজ পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করে
তাই শুধু একটি ডোজ নয়, সম্পূর্ণ টিকা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টিকার ডোজ ও সময়সূচি
বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী—
প্রথম ডোজ
শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে
দ্বিতীয় ডোজ
শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে
বিশেষ ক্যাম্পেইন
হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সরকার বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে—
৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের
অতিরিক্ত টিকা প্রদান করতে পারে।
টিকা কোথায় দেওয়া হয়?
বাংলাদেশে সরকারিভাবে হাম টিকা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
টিকা পাওয়া যায়—
ইপিআই টিকাদান কেন্দ্র
ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র
কমিউনিটি ক্লিনিক
সরকারি হাসপাতাল
শিশুকে সাধারণত বাহুর উপরিভাগে ইনজেকশনের মাধ্যমে টিকা দেওয়া হয়।
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
হামের টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। তবে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সাময়িক ও হালকা প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ইনজেকশনের স্থানে লালচে ভাব
হালকা ফোলা বা ব্যথা
মৃদু জ্বর
শরীরে হালকা র্যাশ
এসব সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়।
কখন টিকা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়?
নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া উচিত—
শিশুর উচ্চ জ্বর থাকলে
গুরুতর অসুস্থতা থাকলে
তীব্র অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে
তবে সাধারণ সর্দি-কাশি থাকলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টিকা দেওয়া সম্ভব।
অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
শুধু প্রথম ডোজ নিলেই সম্পূর্ণ সুরক্ষা হয় না
দ্বিতীয় ডোজ অবশ্যই নিতে হবে
টিকা কার্ড সংরক্ষণ করুন
নির্ধারিত সময় মিস হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন
হাম আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখুন
শিশুকে পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি দিন
বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা গ্রহণের হার কমে গেলে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। শহর ও গ্রামের কিছু এলাকায় এখনো টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা ও অবহেলার কারণে শিশুরা ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“একটি শিশুকে টিকা না দেওয়া মানে শুধু সেই শিশুই নয়, পুরো সমাজকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।”
বিশেষজ্ঞ মতামত (রিপোর্টে ব্যবহারযোগ্য)
“হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়। সময়মতো দুই ডোজ টিকা নিলে প্রায় শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।”
— জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
“অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করাই হামের ঝুঁকি কমানোর প্রধান উপায়।”
— শিশু বিশেষজ্ঞ
রিপোর্টের জন্য সম্ভাব্য ভয়েসওভার লাইন
“একটি ছোট্ট টিকা বাঁচাতে পারে একটি শিশুর জীবন। হামকে অবহেলা নয়, প্রতিরোধই হোক সচেতনতার প্রথম পদক্ষেপ।”
“সময়মতো হাম টিকা নিশ্চিত করুন, শিশুকে রাখুন নিরাপদ।”
নিউজটি আপডেট করেছেন : Mahi Liakat
কমেন্ট বক্স