বাংলাদেশ ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলার পেছনে যেসব বিদেশি কোচের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, তাদের অন্যতম দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি পেসার অ্যালান ডোনাল্ড। ‘হোয়াইট লাইটনিং’ নামে পরিচিত সাবেক এই তারকা বোলার বাংলাদেশ দলের দায়িত্বে থাকাকালে পেসারদের শুধু গতি ও সুইংয়ের ওপর নয়, মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিপক্ষকে ভয় না পাওয়ার মানসিকতার ওপরও জোর দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য, তরুণ পেসারদের উত্থান এবং দলের পরিবর্তিত মানসিকতা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে চ্যানেল ২৪ অনলাইনের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে নিজের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন অ্যালান ডোনাল্ড।
বাংলাদেশের পেস আক্রমণের বর্তমান সাফল্যে নিজেরও কিছুটা অবদান রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেনদের পারফরম্যান্সে গর্বিত সাবেক এই বোলিং কোচ।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ ডোনাল্ড
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে অ্যালান ডোনাল্ড বলেন, প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সেটি ছিল অসাধারণ।
তার মতে, এমন পারফরম্যান্স কেবল স্কিলের কারণে সম্ভব নয়; এর পেছনে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস ও সাহসী মানসিকতা।
বিশেষ করে বাংলাদেশের বোলারদের পারফরম্যান্স তাকে মুগ্ধ করেছে। হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট, অন্য বোলারদের কার্যকর অবদান এবং পরে ব্যাটারদের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং—সব মিলিয়ে পুরো দলীয় পারফরম্যান্সকে অসাধারণ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
স্পিনারদের বিপক্ষে বাংলাদেশ যেভাবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেছে, সেটিও ডোনাল্ডের নজর কেড়েছে।
হাসান মাহমুদের প্রতিভা প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলেন
বর্তমান বাংলাদেশ পেস আক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হাসান মাহমুদের প্রতিভা জাতীয় দলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বুঝতে পেরেছিলেন বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রথম যখন হাসান মাহমুদকে দেখেন, তখনো জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠেননি এই তরুণ পেসার। কিন্তু হাসানের সামগ্রিক বোলিং দক্ষতা তাকে মুগ্ধ করেছিল।
তৎকালীন প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর সঙ্গেও হাসানকে নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ডোনাল্ড। রাসেল ডমিঙ্গোরও ধারণা ছিল, হাসান জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়ার খুব বেশি দূরে নেই।
আজ সেই হাসানই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন।
নাহিদ রানাকে দেখেই রাসেল ডমিঙ্গোকে ডেকেছিলেন
বাংলাদেশের বর্তমান পেস আক্রমণের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি নাহিদ রানা। অ্যালান ডোনাল্ড জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের একটি ক্যাম্পে নাহিদকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা তার এখনো মনে আছে।
তরুণ নাহিদকে বল করতে দেখে তিনি এতটাই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন যে, তখনকার কোচ রাসেল ডমিঙ্গোকে ডেকে এনে নাহিদের বোলিং দেখতে বলেছিলেন।
সেই তরুণ পেসারই এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের গতি ও আগ্রাসী বোলিং দিয়ে নজর কেড়েছেন।
ডোনাল্ডের মতে, নাহিদ রানা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের কাছেও নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন।
‘এই বোলিং আক্রমণের সাফল্যে আমারও ভূমিকা ছিল’
বাংলাদেশের বর্তমান পেস বোলিং আক্রমণের সাফল্যে নিজেরও কিছুটা ভূমিকা রয়েছে—এ কথা বলতে দ্বিধা করেননি ডোনাল্ড।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে পেসারদের সঙ্গে কাজ করার সময় তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এবং নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তাসকিন আহমেদকে দলের পেস আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে দেখেছেন তিনি। তার সঙ্গে তরুণ হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা এবং ইবাদত হোসেনদের মতো পেসাররা ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন।
বর্তমানে এই পেস আক্রমণ দেশের বাইরেও সাফল্য পাচ্ছে—এটিকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন তিনি।
বদলে গেছে বাংলাদেশের মানসিকতা
ডোনাল্ডের মতে, তার সময়ে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কাজ করা হয়েছিল মানসিকতার পরিবর্তন নিয়ে।
পেসার ও দলের ক্রিকেটারদের উদ্দেশে তিনি বারবার একটি কথাই বলতেন—নিজেদের দক্ষতার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।
প্রতিপক্ষ যত বড়ই হোক, নিজেদের স্বাভাবিক খেলায় বিশ্বাস রেখে মাঠে নামতে হবে। প্রতিপক্ষের নাম বা শক্তি দেখে মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়লে চলবে না।
তার মতে, বর্তমান বাংলাদেশ দল সেই মানসিকতার অনেকটাই ধারণ করতে শুরু করেছে।
‘অন্য কারও বিপক্ষে এক পা-ও পিছিয়ে যেও না’
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের উদ্দেশে ডোনাল্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল—নিজেদের স্কিলের ওপর আস্থা রাখো এবং প্রতিপক্ষকে ভয় পেয়ো না।
তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যদি নিজেদের স্বাভাবিক দক্ষতার ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস রাখতে পারে, তাহলে তারা বিশ্বের যেকোনো দলকে হারানোর সামর্থ্য রাখে।
ডোনাল্ডের ভাষায়,
“অন্য কারও বিপক্ষে এক পা-ও পিছিয়ে যাওয়া উচিত নয় এবং নিজেদের স্বাভাবিক দক্ষতার ওপর বিশ্বাস রাখা উচিত।”
এই মানসিকতাকেই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
দেশের বাইরে সাফল্যই বড় পরিবর্তন
একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি ছিল দেশের বাইরে টেস্ট ও দ্বিপক্ষীয় সিরিজে ধারাবাহিক সাফল্যের অভাব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
ডোনাল্ড মনে করেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা এখন শুধু দেশের মাটিতে নয়, বিদেশের কঠিন কন্ডিশনেও প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে শিখেছে।
অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন পারফরম্যান্স বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় আত্মবিশ্বাসের জায়গা তৈরি করবে বলেও মনে করেন তিনি।
আবারও কি বাংলাদেশে ফিরতে পারেন ডোনাল্ড?
বাংলাদেশের সঙ্গে অ্যালান ডোনাল্ডের সম্পর্ক এখনো ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বিশেষ। তার সময়েই বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণে নতুন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল।
বর্তমান পেসারদের অনেকেই তার সময়ের কাজ ও দর্শনের সুফল পাচ্ছেন। তাই বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবারও তার ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে আবার বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ডোনাল্ডের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা বা নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে আপাতত বিষয়টি সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য ডোনাল্ডের মূল বার্তা
অ্যালান ডোনাল্ডের কথার সারকথা একটাই—জিততে হলে আগে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।
প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড কিংবা অন্য যেকোনো বড় দল—নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। মাঠে নিজেদের দক্ষতা, পরিকল্পনা এবং মানসিক দৃঢ়তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করাই সাফল্যের চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের তরুণ পেসারদের সাম্প্রতিক উত্থানও যেন সেই দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন। গতি, আগ্রাসন আর আত্মবিশ্বাস—এই তিন অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ এখন বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের নতুন পরিচয় তৈরি করছে।
সামালা টিভি | দেশ ও মানুষের কথা বলে...
