যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে তেহরান—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (FT)। পত্রিকাটি ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে থাকা কয়েকটি মার্কিন সামরিক সম্পদকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখন পর্যন্ত হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়িত কোনো পরিকল্পনার ঘোষণা নয়; বরং সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে আলোচনা ও মূল্যায়নের খবর।
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে বুলগেরিয়ার বিমানঘাঁটি
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে বুলগেরিয়ার বেজমার (Bezmer) বিমানঘাঁটির নাম এসেছে।
গত জুলাইয়ে বুলগেরিয়ার পার্লামেন্ট বেজমার বিমানঘাঁটিতে সর্বোচ্চ আটটি মার্কিন KC-135 আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং সর্বোচ্চ ২৫০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য মোতায়েনের অনুমোদন দেয়। এই বিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অভিযানে সহায়তার জন্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
ইরান এরই মধ্যে বুলগেরিয়ার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কূটনৈতিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে। বুলগেরিয়া অবশ্য জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে না।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বুলগেরিয়ার কর্তৃপক্ষ বেজমার বিমানঘাঁটির নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাইপ্রাসও সম্ভাব্য ঝুঁকিতে
ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর আলোচনায় সাইপ্রাসের ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাও উঠে এসেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে অবস্থিত ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের আক্রোতিরি ঘাঁটিকে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। মার্চে ওই ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছিল।
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতি থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইউরোপের এই দ্বীপরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কাছে এমন মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের কিছু সামরিক স্থাপনায় পৌঁছানোর সক্ষমতা রাখে। তবে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে নির্ভুলতা ও বিস্ফোরক বহনের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে বলে বিশ্লেষণ রয়েছে।
এর অর্থ হলো, ইউরোপের কোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সামর্থ্য নিয়ে আলোচনা থাকলেও সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
সাবমেরিন কেবল নিয়েও উদ্বেগ
শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, উত্তেজনা আরও বাড়লে সমুদ্রের নিচে থাকা ফাইবার-অপটিক কেবল লক্ষ্য করার সম্ভাবনাও ইরানি সামরিক পরিকল্পনায় বিবেচনা করা হয়েছে বলে FT-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
এই ধরনের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু সামরিক যোগাযোগ নয়, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট, আর্থিক লেনদেন ও বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
কেন ইউরোপকে লক্ষ্য করার কথা ভাবছে তেহরান?
ইরানের অবস্থান হলো, তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যে বিদেশি ঘাঁটি বা অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে, সেগুলো প্রয়োজনে প্রতিশোধমূলক হামলার বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের কোনো ঘাঁটি যদি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে, তাহলে সেটি তেহরানের সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
এদিকে বুলগেরিয়া স্পষ্টভাবে বলেছে, বেজমার ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান মোতায়েনকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ হিসেবে দেখছে না। দেশটির প্রধানমন্ত্রীও জানিয়েছেন, সেখানে মোতায়েন করা বিমানগুলো নন-কমব্যাট মিশনে ব্যবহারের জন্য।
সংঘাত কি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপে মার্কিন সামরিক স্থাপনা, ব্রিটিশ ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোকে ঘিরে নতুন হুমকির আলোচনা সেই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত ইউরোপে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো নতুন হামলা শুরু হয়নি। প্রকাশিত তথ্যগুলো মূলত সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প নিয়ে মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
সামালা টিভির বিশ্লেষণ: বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—মধ্যপ্রাচ্যের একটি সংঘাত যদি ইউরোপের মার্কিন বা মিত্রদেশের সামরিক স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। সে ক্ষেত্রে একটি আঞ্চলিক সংঘাত আরও বড় আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তথ্যসূত্র: Financial Times, Anadolu Agency, Bulgarian News Agency (BTA)
সামালা টিভি | দেশ ও মানুষের কথা বলে...
